ইসলামে পিতা-মাতার সম্মানের গুরুত্ব ও করণীয় | Respecting Parents in islam
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের ক্ষেত্রে ইসলাম যাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে, তা হলো পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। পিতা-মাতা আমাদের পৃথিবীতে আসার মাধ্যম। তাদের অসীম ত্যাগ, স্নেহ ও ভালোবাসার কোনো বিকল্প হয় না।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব, পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোক তাদের অধিকার এবং বাস্তব জীবনে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. পিতা-মাতার প্রতি সম্মানের গুরুত্ব: কুরআন মাজীদের নির্দেশনা
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের একাধিক স্থানে নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকেই অনুধাবন করা যায়, ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা কতটা উঁচুতে।
সূরা বনী-ইসরাঈলের ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"আপনার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' (বিরক্তিপ্রকাশক শব্দ) বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সদয়ভাবে কথা বলো।"
এই আয়াতের মূল শিক্ষাগুলো হলো:
আল্লাহর তাওহীদের (একত্ববাদ) পরপরই পিতা-মাতার স্থান।তাদের আচরণে বিরক্ত হয়ে 'উফ' শব্দটিও বলা যাবে না।বার্ধক্যে তাদের সাথে সবচেয়ে কোমল ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে।
২. মায়ের অবদানের বিশেষ স্বীকৃতি
ইসলামে পিতা-মাতা উভয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হলেও, মায়ের ত্যাগের কারণে তাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। গর্ভধারণ, প্রসব বেদনা এবং দুগ্ধপানের মতো চরম কষ্টের ধাপগুলো একজন মা পার করেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করেছে..." (সূরা লোকমান: ১৪)
একটি বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার থেকে উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?" রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" চতুর্থবার জিজ্ঞেস করার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "তোমার পিতা।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
৩. পিতা-মাতার আনুগত্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি
সন্তানের ওপর পিতা-মাতার সন্তুষ্টির প্রভাব সরাসরি পরকালের সাথে যুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।" (জামে তিরমিযী)
এমনকি যদি পিতা-মাতা অমুসলিমও হন, তবুও দুনিয়াবি বিষয়ে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। তবে যদি তারা আল্লাহর অবাধ্যতা বা শিরক করার আদেশ দেন, কেবল সেক্ষেত্রেই তাদের আদেশ অমান্য করা যাবে, কিন্তু তাও করতে হবে অত্যন্ত ভদ্র ও নম্রভাবে।
৪. বাস্তব জীবনে পিতা-মাতার প্রতি আমাদের করণীয়
পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় উল্লেখ করা হলো:
নম্র আচরণ: সর্বদা তাদের সামনে কণ্ঠস্বর নিচু রাখা এবং বিনয়ী হওয়া।ভরণ-পোষণ ও সেবা: বিশেষ করে তাদের বার্ধক্যে শারীরিক ও আর্থিক দেখভাল করা সন্তানের প্রধান দায়িত্ব।পরামর্শ নেওয়া: জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে তাদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা এবং মতামত নেওয়া।ধৈর্য ধারণ: বার্ধক্যে তারা কখনো খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠলে পরম ধৈর্যের সাথে তা মোকাবেলা করা।দোয়া করা: জীবিত বা মৃত—সব অবস্থাতেই পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা।
৫. পিতা-মাতার জন্য কুরআনিক দোয়া
আল্লাহ তাআলা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করতে হবে। সূরা বনী-ইসরাঈলের ২৪ নম্বর আয়াতে এই দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে:
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ: "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।"
অর্থ: "হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে দয়া ও স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন।"
৬. পিতা-মাতার অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতি
ইসলামে পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়াকে 'কবিরা গুনাহ' বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বড় বড় গুনাহগুলোর বিবরণ দিতে গিয়ে আল্লাহর সাথে শিরক করার পরেই পিতা-মাতার অবাধ্যতা-কে স্থান দিয়েছেন।
অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়ার শাস্তি আল্লাহ তাআলা পরকালের পাশাপাশি এই দুনিয়াতেও দ্রুত দিয়ে দেন। যে সন্তান তার পিতা-মাতাকে অবহেলা করে, সে দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত হয় এবং তার নিজের সন্তানও ভবিষ্যতে তার সাথে অনুরূপ আচরণ করে।
ইসলামে পিতা-মাতার সম্মানের গুরুত্ব ও করণীয় বিষয়ে আমার শেষ কথা
পিতা-মাতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক অনন্য নিয়ামত। তাদের সেবা করার সুযোগ পাওয়া মানে জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত (লাঞ্ছিত) হওয়ার বদদোয়া করেছেন, যে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে পেয়েও জান্নাত লাভ করতে পারলো না।
তাই আসুন, আজ থেকেই আমরা আমাদের পিতা-মাতার প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হই। তাদের প্রতিটি বৈধ আদেশ মেনে চলি, ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখি এবং নিয়মিত তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার বাধ্যগত ও অনুগত সন্তান হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী ও আমাদের উত্তর:
১. প্রশ্ন: পিতা-মাতা যদি অমুসলিম বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হন, তবে কি তাদের আনুগত্য করতে হবে?
উত্তর: ইসলামে আল্লাহর অবাধ্যতা বা শিরকের কাজে পিতা-মাতার আনুগত্য করা যাবে না। তবে এই আদেশ অমান্য করার সময়েও তাদের সাথে কোনো রকম খারাপ আচরণ বা অসম্মান করা যাবে না, বরং দুনিয়াবি বিষয়ে তাদের প্রতি সদয় ও বিনয়ী থাকতে হবে।
২. প্রশ্ন: পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের প্রতি সন্তানের কি কোনো দায়িত্ব থাকে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তানের প্রধান দায়িত্ব হলো—তাদের জন্য নিয়মিত মাগফিরাত ও ক্ষমার দোয়া করা, তাদের নামে দান-সদকাহ (সদকায়ে জারিয়া) করা, তাদের কোনো ঋণ বা ওসিয়ত থাকলে তা পূরণ করা এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
৩. প্রশ্ন: পিতা-মাতার অবাধ্যতার দুনিয়াবি পরিণতি কী হতে পারে?
উত্তর: পিতা-মাতাকে কষ্ট দিলে বা তাদের অবাধ্য হলে তার শাস্তি আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেই দিয়ে দেন। এমন সন্তানের রিজিকে বরকত কমে যায়, জীবনে নানা অশান্তি নেমে আসে এবং পরবর্তীতে তাদের নিজেদের সন্তানরাও তাদের সাথে একই রকম খারাপ আচরণ করে।
