হিংসা আসলে কী | হিংসা কেন মারাত্মক গুনাহ | হিংসা থেকে বাঁচার উপায়
হিংসা এমন একটি মনের রোগ যা মানুষকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়। আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে আমাদের মনে হিংসা জন্ম নিয়েছে। অথচ এই হিংসাই আমাদের ইমান, আমল এবং পারিবারিক শান্তি নষ্ট করে দেয়। আজকের এই পোস্টে আমরা জানবো হিংসা আসলে কী, হিংসা কেন মারাত্মক গুনাহ এবং হিংসা থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত।
হিংসা আসলে কী
হিংসা বলতে বোঝায় অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারা এবং তার নিয়ামত নষ্ট হয়ে যাক এই কামনা করা। ইসলামি পরিভাষায় হিংসাকে বলা হয় হাসাদ।
যেমন আপনার প্রতিবেশী একটি নতুন বাড়ি করেছে বা আপনার বন্ধু ভালো চাকরি পেয়েছে, এটা দেখে যদি আপনার মনে কষ্ট হয় এবং মনে মনে চান যে তার এই ভালোটা নষ্ট হয়ে যাক, তাহলেই সেটা হিংসা। এটি মনের একটি গোপন রোগ। বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষকে জ্বালিয়ে দেয়।
হিংসা কিভাবে আমাদের মনে জন্ম নেয়
হিংসা হঠাৎ করে আসে না। এর পেছনে কিছু কারণ থাকে।
প্রথমত অহংকার থেকে হিংসা জন্ম নেয়। যখন কেউ নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করে তখন অন্যের উন্নতি সে সহ্য করতে পারে না।দ্বিতীয়ত লোভ থেকে হিংসা আসে। অন্যের সম্পদ বা সম্মান দেখে যখন নিজের মনে লোভ জাগে তখনই হিংসার সৃষ্টি হয়।তৃতীয়ত শত্রুতা এবং রাগ থেকেও হিংসা তৈরি হয়। কারো সাথে মনোমালিন্য থাকলে তার ভালো দেখলেই মনে হিংসা জাগে।
হিংসা কেন মারাত্মক গুনাহ
ইসলামে হিংসাকে অন্তরের সবচেয়ে বড় গুনাহগুলোর একটি বলা হয়েছে। এটি কেন এত মারাত্মক তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো।
হিংসা কি আমাদের নেক আমল নষ্ট করে দেয়
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে। যখন একজন মানুষ হিংসা করে তখন তার ভেতরে থাকা ভালো কাজগুলোর সওয়াব আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যায়। সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে কিন্তু হিংসার কারণে তার আমলের কোনো বরকত থাকে না।
হিংসা কি আল্লাহর ফয়সালার বিরোধিতা
যখন আল্লাহ কাউকে কোনো নিয়ামত দেন সেটা আল্লাহর ইচ্ছায় দেন। আপনি যখন সেই নিয়ামত নিয়ে হিংসা করেন তখন আপনি মূলত আল্লাহর বণ্টনকে অপছন্দ করছেন। আপনি মনে মনে বলছেন যে আল্লাহ কেন তাকে দিলেন আমাকে কেন দিলেন না। এটি আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, যা অত্যন্ত ভয়াবহ গুনাহ।
হিংসা কি সমাজে অশান্তি তৈরি করে
হিংসা শুধু নিজের ক্ষতি করে না, পুরো সমাজ এবং পরিবার ধ্বংস করে দেয়। হিংসা থেকেই গীবত, চোগলখোরি, মিথ্যা অপবাদ এবং মারামারি সৃষ্টি হয়। অনেক সুখী পরিবার শুধু হিংসার কারণে ভেঙে গেছে। ভাইয়ে ভাইয়ে শত্রুতা, বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার মূল কারণ এই হিংসা।
কোরআন ও হাদিসে হিংসা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে বলেছেন। সুরা ফালাকে আল্লাহ বলেন, এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।
হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না এবং একে অপরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও।
হিংসা এবং ঈর্ষার মধ্যে পার্থক্য কী
অনেকে হিংসা এবং ঈর্ষাকে এক মনে করেন, কিন্তু দুটির মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে।
হিংসা হলো অন্যের ভালো নষ্ট হয়ে যাক এই কামনা করা। এটি হারাম।
আর ঈর্ষা বা গিবতা হলো অন্যের মতো ভালো কিছু নিজেও পেতে চাওয়া কিন্তু তার ক্ষতি কামনা না করা। যেমন একজন ভালো হাফেজকে দেখে মনে মনে চাওয়া যে আমিও তার মতো হাফেজ হতে চাই। এটাকে ইসলামে জায়েজ বলা হয়েছে এবং এটি ভালো।
হিংসা থেকে বাঁচার উপায় কী
হিংসা থেকে বাঁচা সম্ভব যদি আমরা কিছু নিয়ম মেনে চলি। নিচে পরীক্ষিত কিছু উপায় দেওয়া হলো।
১. তাকদিরের উপর বিশ্বাস দৃঢ় করবেন কিভাবে
মনে প্রাণে বিশ্বাস করুন যে রিজিক এবং সম্মান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ যাকে যতটুকু দেওয়ার ততটুকুই দেবেন। অন্যের ভাগেরটা কখনো আপনার কাছে আসবে না এবং আপনার ভাগেরটা অন্য কেউ নিতে পারবে না। এই বিশ্বাস মনের মধ্যে বসাতে পারলে হিংসা অনেক কমে যাবে।
২. হিংসুক ব্যক্তির জন্য দোয়া করবেন কেন
এটি হিংসা দূর করার সবচেয়ে বড় ওষুধ। যার প্রতি আপনার হিংসা হয় তার জন্য মনে মনে দোয়া করুন। আল্লাহ যেন তার সম্পদে আরও বরকত দেন। প্রথমে কষ্ট হলেও এভাবে দোয়া করতে থাকলে আল্লাহ আপনার মন থেকে হিংসা তুলে নেবেন এবং আপনার নিজের মনেও শান্তি আসবে।
৩. নিজের নিয়ামতের দিকে তাকাবেন কিভাবে
অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজের দিকে তাকান। আল্লাহ আপনাকে কত কিছু দিয়েছেন তা নিয়ে ভাবুন। আপনার সুস্থ শরীর, পরিবার, চোখ, হাত এগুলো অনেকের নেই। যখন আপনি নিজের নিয়ামত নিয়ে শুকরিয়া আদায় করবেন তখন অন্যের প্রতি হিংসা করার সময় পাবেন না।
৪. বেশি বেশি জিকির এবং ইস্তেগফার করবেন কেন
হিংসা হলো অন্তরের ময়লা। আর এই ময়লা পরিষ্কার হয় আল্লাহর জিকিরে। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় সুরা ফালাক, সুরা নাস পড়ুন এবং আস্তাগফিরুল্লাহ বেশি বেশি পড়ুন। মনে হিংসা এলেই আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম পড়ুন। শেষ জামানার ইবাদত কারীদের জন্য বিশেষ টিপস...
শেষ কথা
হিংসা একটি নীরব ঘাতক। এটি মানুষের দুনিয়া এবং আখিরাত দুটোই ধ্বংস করে দেয়। তাই আজ থেকেই নিজের মনকে হিংসা মুক্ত করার চেষ্টা করুন। অন্যের ভালো দেখে খুশি হতে শিখুন। মনে রাখবেন অন্যের জন্য ভালো চাইলে আল্লাহ আপনার ভালো আরও বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে হিংসার মতো মারাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন।

informative post